নারী নির্যাতনের দেশে ‘নারী দিবস’ কতটা অর্থবহ?
২৬ মে, ২০২৬ ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন

  

নারী নির্যাতনের দেশে ‘নারী দিবস’ কতটা অর্থবহ?

কাউসার খান, বিশেষ প্রতিনিধি
০৮-০৩-২০২৫ ০২:১৩ অপরাহ্ন
নারী নির্যাতনের দেশে ‘নারী দিবস’ কতটা অর্থবহ?
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। তাই মার্চ মাস আসতে না আসতেই বিভিন্ন নারীবাদী সংগঠন, এনজিও, বিভিন্ন করপোরেট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। আবার নারী দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন হাসপাতাল সেমিনারের পাশাপাশি দিনব্যাপী ফ্রি হেলথ ক্যাম্পের আয়োজন করে। এ সময়ে আবার অনলাইনে বেগুনি রঙের শাড়ির বেচাকেনাও তুঙ্গে ওঠে। ফলে ৮ই মার্চ চারিদিকে একটা উৎসব উৎসব রব থাকে।

কিন্তু শত বছরেরও আগে যাদের কারণে এই নারী দিবসের উৎপত্তি, সেই শ্রমজীবী নারীরা এ দেশে কেমন আছেন, তার খোঁজ আমরা অনেকেই রাখি না। নারী দিবসের পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী নারীদের অবদান। নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, উন্নত কর্মপরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা এবং ভোটাধিকারের দাবির মধ্যে লুকিয়ে আছে নারী দিবসের বীজ। যাদের কারণে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, যারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশাল অবদান রাখছেন, তাদের কথা কি আমরা মনে রাখছি? এই শ্রমজীবী নারীরা কি নারী দিবস কেন পালন করা হয় জানেন? তাঁরা কি জানেন তাদের শ্রম কীভাবে মুনাফার বাজারে ধাপে ধাপে বিলীন হয়ে যায়?

এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য সকল নারী ও কন্যার অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন। নারীর ক্ষমতায়ন মানে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। নারী ও কন্যারা কি অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন পাচ্ছেন? এ দেশে নারী ও কন্যার অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন ততদিন পর্যন্ত আসবে না, যতদিন সমাজে পুরুষতান্ত্রিককাঠামো থাকবে। পুরুষতন্ত্র নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। কেন বলছি এ কথা? কারণ আমাদের এ সমাজ পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজর কারণে সমাজের একটা অংশ মনে করে নারীরা দুর্বল ও ক্ষমতাহীন। তাই নারীকে যা খুশি তা বলা যাবে, তাকে ইচ্ছেমতো হেনস্তা, হেয়প্রতিপন্ন, নির্যাতন করা যাবে।

আত্মহত্যা মানুষের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত। আত্মহত্যা মানে জীবনের কাছে হেরে যাওয়া। আফসানা যে কারণেই আত্মহত্যা করুক না কেন, এই আত্মহত্যার পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো। যে কাঠামোতে নারীকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। তাই আফসানার মতো অসহায় নারীরা অন্য কোনো উপায় না পেয়ে আত্মহত্যার দিকে পা বাড়ান।

সমাজ বাস্তবতায় ক্রমশ নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নারী দিবসের প্রাসঙ্গিকতায় নারীদের অধিকার কতটুকু অর্জিত হচ্ছে? এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘১৯০৮ সালে ঘোষিত এই দিনটি আজও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মধ্যে আটকে রইল। আজও নারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। নারীর ওপর দমন‑পীড়ন চলছেই। চব্বিশের আগস্টের ৫ তারিখে আমরা তরুণদের নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট শাসকদের হটিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, কিন্তু আজও পুরুষতন্ত্র থেকে তো মুক্তি মেলেনি।’

এই উপদেষ্টার মতে, ‘এটা খুব দুঃখজনক এবং উদ্বেগের বিষয় যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটেছে। পারিবারিক সহিংসতাও ক্রমাগতভাবে ঘটে চলেছে। এই ঘটনাগুলোকে হালকাভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। আইন‑শৃঙ্খলার ব্যর্থতা আছে সন্দেহ নাই, কিন্তু সামাজিকভাবে কিছু প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব দেখা যাচ্ছে, যা নারীকে ভিন্নভাবে তুলে ধরতে চাচ্ছে। নারীকে পিছিয়ে দিতে চাচ্ছে।’

নারী দিবস মূলত অধিকার আদায়ের দিন। নারী দিবসের মূল বাণী কতটুকু অর্জিত হয়েছে? এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘নারী দিবস মূলত অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার দিবস। নারী দিবসের পথ পরিক্রমায় দেখা যায়, নারীর জীবনে, নারীর আন্দোলনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন নারীরা তাদের অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ করছে। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে আসছে। এটা সামগ্রিকভাবে নারীদের সফলতা বলা যায়। তবে নারী নির্যাতন কমেনি। দেশে আইন থাকা সত্ত্বেও নারী নির্যাতন কমছে না। নারী নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না। তাই সমাজে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।’

ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘নারীর ইস্যু আসলে শুধু নারীর বিষয় না। এটা যে সমাজের ইস্যু–এই বিষয়টি সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত নারীর অধিকার অর্জিত হবে না। এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য সকল নারী ও কন্যার অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন। এ কাজে আমরা যদি নারী‑পুরুষ উভয়ে সম্পৃক্ত হয়ে এগিয়ে আসতে পারি তাহলে নারীর সম অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠিত হবে না। এ কথা সঠিক যে, সমাজে নারী নিপীড়নের ঘটনা কমছে না। এ ক্ষেত্রে জড়িতদের পার পাওয়ার সংস্কৃতিও বেড়েছে। ফলে নারীর অধিকার আদায় তো দূরের কথা, নির্যাতন‑নিপীড়নের হাত থেকেও তারা রক্ষা পাচ্ছে না। এই অবস্থায় নারী দিবস কতটুকু তাৎপর্য বহন করে?

এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্যে আছে নারী ও কন্যার অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে নারী ও কন্যার অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন অর্জিত হচ্ছে না। আমরা যদি দেশের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের ঘটনায় নারীকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও দেখেছি সম্মুখ সারিতে ছিল অনেক নারী। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তাঁরা ধীরে ধীরে পেছনের দিকে চলে গেলেন।’

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবীর মতে, ‘৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম সমাজের কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে। মানুষ তার মৌলিক মানবাধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু শুরু থেকে আমরা হোঁচট খাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের নিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হলো, সেখানে লৈঙ্গিক পরিচিতির কারণে একজন মানুষকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। সম্প্রতি লালমাটিয়ায় দুজন নারীর ধূমপান করার অভিযোগে তাদের যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, যেভাবে মবের মাধ্যমে আক্রমণ করা হয়েছে–এই ঘটনায় রাষ্ট্রের যে প্রতিক্রিয়া বা পর্যবেক্ষণ থাকার কথা ছিল, সেটা পরিলক্ষিত হয়নি। এই ঘটনায় মনে হয়েছে, এ সমাজের কিছু মানুষ মনস্তাত্ত্বিকভাবে নারী অধিকার ও সমতা মেনে নিতে পারে না। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাদের কমেন্ট দেখা গেছে, সেসব কমেন্টকে খুব হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটাই আমাদের সমাজের চিত্র।’

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। কিন্তু বর্তমানে নারী শ্রমিকেরা কি নারী দিবসের সুফল পাচ্ছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহসভাপতি জলি তালুকদার বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস মূলত শ্রমজীবী নারীদের ভোটাধিকার, ন্যায্যমজুরি, ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার ইত্যাদি দাবিতে বিরাট আন্দোলনের ফসল। কিন্তু সারা পৃথিবীতে আজ আমরা দেখতে পাই, এই সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির নেতিবাচক প্রভাবে নারীদের অধিকার প্রতিনিয়ত ভুলণ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের দেশের অর্থনীতি যারা টিকিয়ে রেখেছে, তাদের মধ্যে পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকেরা অন্যতম। শ্রম বাজারে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। কিন্তু নারীদের জীবনের মানে তেমন উন্নয়ন হয়নি। পুরুষের তুলনায় কম মজুরিতে তাদের জীবন নির্বাহ করতে হয়।’

শ্রমিকনেতা জলি তালুকদার মনে করেন, ‘সমাজ, পরিবার ও ধর্মীয় অনুশাসনের ফলে নারীরা প্রতিটি পদক্ষেপে নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মর্মবাণী যেভাবে দেশের শ্রমজীবী নারী এবং সমগ্র নারী সমাজের মধ্যে কাজ করার কথা ছিল প্রকৃতপক্ষে আমরা তার বিপরীত চিত্রই দেখতে পাচ্ছি। নারীরা ঘরে বাইরে সর্বত্র শোষণের শিকার। সমাজে ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনা ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ধর্ষণকারীরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারের দিক থেকে ধর্ষকদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বললেই চলে। অথচ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শত শত নারী সাহসের সাথে লড়াই করছে, পুলিশি নির্যাতন মোকাবিলা করেছে। সেসব নারী বিরাট চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে এই পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে। এর বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলা সময়ের দাবি।’

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ ও মোরাল পুলিশিংয়ের নামে নারীকে হেনস্তা করা–এই সবই ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ নিয়ে সমাজের নানা শ্রেণি‑পেশার মানুষ নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন, মিছিল এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কিন্তু এত এত ক্ষোভ ও প্রতিবাদের পরও নারীর ওপর নিপীড়ন ও হেনস্তা কমছেই না, যা গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকা অনেককেও ভীষণভাবে হতাশ করছে। অনেকেরই অভিযোগ অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশ্য পথে নারীকে আক্রান্ত করা ব্যক্তিদের প্রতি নমনীয় আচরণ করছে।

এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘নারীর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়ে এক ধরনের ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা–আমাদের খতিয়ে দেখা উচিত। তবে সরকারের দায়িত্ব অবশ্যই নারীদের নিরাপত্তা দেওয়া। এটা সন্তোষজনকভাবে করা যাচ্ছে না, তার জন্যে দুঃখপ্রকাশ করছি। তবে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

সূত্রঃ ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


কাউসার খান, বিশেষ প্রতিনিধি ০৮-০৩-২০২৫ ০২:১৩ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 126 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  ঠিকানা :   চাঁদপুর বুলেটিন, সম্পাদকীয় কার্যালয়: পৌর মার্কেট (দ্বিতীয় তলা), হাজী মহসিন রোড, নতুন বাজার, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর (পূবালী ব্যাংকের সামনে)।
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   chandpurbulletin@gmail.com

সম্পাদক ও প্রকাশক: আলআমিন ভূঁইয়া