শিরোনামঃ
কাউসার খান, বিশেষ প্রতিনিধি ২৯-০৩-২০২৫ ০২:২২ অপরাহ্ন |
এদিকে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সংগঠিত ছাত্র-জনতার একটি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারি করা পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পরপরই কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে এর সূচনা হয় এবং ৫ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাস্টিট শেখ হাসিনার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি হয়। গঠিত হয় অন্তর্বতীকালীন সরকার।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর থেকেই পুলিশ বাহিনী ব্যবস্থা ভেঙে পরে। আর এ সুযোগে সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুরেও বাসা-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারিত্ব ও মাদক ব্যবসাসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বৃদ্ধি পায়। সরকার পতনের পর থেকেই দেশের সার্বিক অবস্থা ঠিক রাখতে বিভিন্ন দপ্তরগুলোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বড়ধরণের রদবদল শুরু হয়। সেই সাথে চাঁদপুরের পুলিশ প্রশাসনেও বড়ধরনের রদবদল হয়। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা যখন অবনতি ঠিক তখন চাঁদপুরে ২৪তম পুলিশ সুপার হিসাবে যোগদান করেন মুহম্মদ আব্দুর রকিব।
গেল বছর ৫ই আগষ্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাঁদপুরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মধ্যে অন্যতম মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় কিশোর গ্যাং। জেলা শহর জুড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং এর উৎপাত বেড়েছে বলে জানা যায়। এর ফলে এলাকাজুড়ে বেড়েছে দখল, চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই ও মারামারির মতো জঘন্য ঘটনা।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, এলাকার কথিত রাজনৈতিক নেতারা তাদেরকে ব্যবহার করে নিজেরা ফায়দা নিচ্ছে। কথিত নেতাদের শেল্টারে বেপরোয়া এ কিশোর গ্যাংয়ের হাতে নাজেহাল হচ্ছে এলাকার ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষ। দিনে দুপুরে বাসা-বাড়িতে চুরি, ছিনতাই ছাড়াও এ চক্রটি পাড়া-মহল্লা, বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান বৈদ্যুতিক তার রাতের আধারে কেঁটে নিয়ে যায়। তারা এতোটাই ভয়ংকর যে সামান্য বিষয়ে গায়ে পরে মানুষকে রাস্তায় অপমান, নাজেহাল ছাড়াও খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না। সন্ধ্যা হলে তারা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়, শপিং কমপ্লেক্সের সামনে, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, বড় রেলস্টেশন, কালিবাড়ি প্লাটফর্ম ,পাল বাজার ব্রীজের কোনায় ও চাঁদপুর টাওয়ার কাছে অস্থায়ী সিএনজি স্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান নেয়। সংঘবদ্ধ এ চক্রটি সুযোগ বুঝে ছোঁ মেরে পথচারীদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়।
বিভিন্ন সূত্রে আরো জানা যায়, কিশোর গ্যাং এর সাথে জড়িত রয়েছে এলাকার বখাটে যুবক, ছিঁচকে চোর, ছিনতাইকারী ও বিপদগামী কিছু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ তটস্থ। কারণ কিশোর গ্যাং সদস্যদের এসব অপকর্মের মূলে থাকে তাদের কথিত ‘বড়ভাই’। শুধু শহরেই নয়, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন বিভিন্ন উপজেলায়ও তৎপর।
সরেজমিনে দেখা যায়, কখনো কখনো নির্মাণাধীন ভবনের মূল্যবান রড, সিমেন্ট চুরির ঘটনায় এলাকাবাসী চোরকে ধরে থানা পুলিশকে জানালেও চোরের বয়স কম হওয়ার কারণে থানা পুলিশ ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে পূর্ণরায় চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, দখল বাণিজ্য ও অবৈধ দেশি অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েই চলেছে। এসব অপকর্ম যারা করছে তাদের বেশির ভাগই কিশোর-তরুণ। তবে নেপথ্যে থাকেন ‘বড় ভাইয়েরা’।
তারা এলাকায় প্রভাব বিস্তার, কোনো ব্যবসায়ী বা বিপক্ষের নেতাকর্মীকে ধমকানো-শাসানো, ইন্টারনেট ব্যবসা বাগিয়ে নেওয়াসহ নানা স্বার্থ উদ্ধারে সন্ত্রাসীদের লালন করেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আশ্রয়প্রশ্রয়ে জেলা শহরের পৌর এলাকা এবং সদর উপজেলাসহ জেলার অন্যান্য উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অন্তত কয়েকডজন কিশোর গ্যাং। যে বয়সে বিদ্যালয়ে থাকার কথা সেই বয়সে রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অপরাধ করে বেড়ালেও এ সন্ত্রাসীদের যেন সাত-খুন মাফ হয়ে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণকারীদের ইশারায়। এই বড় ভাইদের অনেকে বিভিন্ন রাজনীতি দলের বড় বড় পদে থাকায় এবং অনেক প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যবস্থা নিতে পারে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এসময় চাঁদপুরের সুযোগ্য পুলিশ সুপার (এসপি) মুহম্মদ আব্দুর রকিবের সুদৃঢ় বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এবং সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয় কিশোর গ্যাং দমনের নানা ব্যবস্থা। এসপির তীক্ষ্ন বুদ্ধিমত্তার কারণে অল্প কিছুদিনের মধ্যে কিশোর গ্যাং দমনে দারুন সফলতা অর্জন করেন জেলা পুলিশ বাহিনী।
চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিনমাসের মধ্যে চাঁদপুর জেলায় ৭১জন কিশোর গ্যাং এর সদস্য এবং ৩২জন ডাকাত গ্রেপ্তার করেছে চাঁদপুর জেলা পুলিশ।
কিশোর গ্যাং দমন বিষয়ে খোলামেলা কথা হয় চাঁদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মুহম্মদ আব্দুর রকিবের সাথে। জানতে চাওয়া হয় কিশোর গ্যাং দমন করতে কী পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমি চাঁদপুরে আসার পর কিছুদিনের মধ্যে এ ব্যাপার পর্যালোচনা করি। অল্পসময় পর্যালোচনা করে নিজের বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে জরুরি সভার আয়োজন করি। সেখানে আমার অফিসারদের বিভিন্ন ধরণের নির্দেশনার পাশাপাশি আমি ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে একটি ঘোষণা দেই কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ উপহারের কথা। বিভিন্ন নির্দেশনা ও উপহারের কথা মাথায় রেখে আমার চৌকস বাহিনী কিশোর গ্যাং দমনে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
এসপি আরো বলেন, আমরা অনেকের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছি কিশোর গ্যাং এর আনাগোনার কথা। এ ব্যাপারে আমরা স্পেশাল ড্রাইভ দিয়ে বেশ কিছু কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের আটক করতে সক্ষম হয়েছি। গত ৩ মাসে আমরা ৭১ জন কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের আটক করতে সক্ষম হয়েছি। এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ প্রশাসনসহ যৌথবাহিনীও কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালানোরও একটা প্রবনতা দেখা দিয়েছিলো, সে ব্যাপারেরও আমরা বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। যারফলে আমরা সফলতাও লাভ করেছি। কিশোর গ্যাং ও উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালানো আমরা একটা নিয়ন্ত্রনের মধ্যে নিয়ে আসছি।
এছাড়াও বিধ্বস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে জানান, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্যে জেলা পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আসন্ন ঈদুল ফিতর উদযাপন প্রসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি বলেন, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে চাঁদপুরবাসীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগত মানুষের ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে চাঁদপুরে প্রবাসীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের নিরাপত্তার জন্যেও জেলা পুলিশ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঈদের সময় কেউ যদি নিজের জান মাল সুরক্ষার কথা নিরাপদ না ভাবে, সেক্ষেত্রে আমাদেরকে জানালে আমরা ওই ব্যক্তির জন্যে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তাদেরকে গন্তব্যস্থলে নিরাপদে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবো। অনেকে এসময় মূল্যবান জিনিসপত্র ও টাকা পয়সা বহন করে থাকেন, সেসময় যদি কেউ নিরাপত্তাহীনতায় থাকে সেক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ টিম স্পট দিয়ে তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিবে।
চাঁদপুর শহরে যানজট প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, ঈদের সময় যানজট নিয়ন্ত্রনে ট্রাফিক পুলিশ জোরদার করা হয়েছে। যানজট নিরসনে আমরা জনবল বাড়ানোরও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।
ঠিকানা : চাঁদপুর বুলেটিন, সম্পাদকীয় কার্যালয়: পৌর মার্কেট (দ্বিতীয় তলা), হাজী মহসিন রোড, নতুন বাজার, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর (পূবালী ব্যাংকের সামনে)।
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : chandpurbulletin@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলআমিন ভূঁইয়া