ফরিদগঞ্জে দুগ্ধ প্রকল্পের টাকা নিয়ে নয়ছয়, খামারিরা হতাশ!
২৬ মে, ২০২৬ ১২:১৮ অপরাহ্ন

  

ফরিদগঞ্জে দুগ্ধ প্রকল্পের টাকা নিয়ে নয়ছয়, খামারিরা হতাশ!

গাজী মমিন, নিজস্ব প্রতিনিধি, ফরিদ্গঞ্জ
১৪-০৫-২০২৫ ০৩:৩৭ অপরাহ্ন
ফরিদগঞ্জে দুগ্ধ প্রকল্পের টাকা নিয়ে নয়ছয়, খামারিরা হতাশ!

দুগ্ধ ঘাটতি উপজেলায় দুগ্ধ সমবায়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ৫০ উপজেলায় ১০০টি সমবায় সমিতি গঠন করে সরবরাহ বাড়াতে ২০২২ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এর মধ্যে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলাও রয়েছে। উপজেলার দুটি দুগ্ধ সমিতির মাধ্যমে ১০০ জনের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ঋণ বিতরণ হয় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। 

অভিযোগ রয়েছে ঋণ গ্রহীতা যাচাই বাছাইয়ে অনিয়ম এবং দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ঋণের টাকা বিনিয়োগ হয়েছে অন্য খাতে। ৬১ জনের মাঝে অনুসন্ধান করে মিলেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। এরমধ্যে ২৯ জনই ঋণের টাকা কোরবানিতে বিক্রির জন্য পশু ক্রয়, অন্যের গোয়াল ঘর দেখিয়ে ঋণ নেয়া, কয়েকজনের নামের টাকা নিয়েছেন একজনই। যদিও উপজেলা সমবায় দপ্তর জানিয়েছে এই ধরণের অনিয়মের তথ্যের প্রাথমিক সত্যতা তারাও পেয়েছেন।

জানা গেছে, ‘দুগ্ধ ঘাটতি উপজেলায় দুগ্ধ সমবায়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের আওতায় ফরিদগঞ্জের উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র ঋণ বন্টন হয়েছে ৩ ইউনিয়নে। এর মধ্যে চান্দ্রা দুগ্ধ সমবায় সমিতির ৫০জন বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের। গাজীপুর দুগ্ধ সমবায় সমিতির ৫০জন হলেন সুবিদপুর পশ্চিম ও পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের বাসিন্দা।
উপজেলা সমবায় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প পরিচালকের উপস্থিতিতে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দুটি দুগ্ধ সমিতির ১০০ জন ঋণ গ্রহীতাদের মাঝে উন্নত জাতের গাভী ক্রয় করার জন্য ১লাখ ৬০ হাজার করে ঋণের চেক প্রদান করা হয়। ঋণ বিতরণের প্রায় ৪ মাস পর অর্থাৎ এপ্রিল মাসেও অনেক ঋণ গ্রহীতা গাভী ক্রয় করেনি।

চান্দ্রা দুগ্ধ সমবায় সমিতির ৫০জন্য ঋণ গ্রহীতা ২৯ জনের মধ্যে অনুসন্ধান চালানো হয়। এর মধ্যে ১৭ জন গাভী ক্রয় করেননি। ঋণের টাকা বিনিয়োগ করেছেন অন্য খাতে। ঋনের টাকা যথাযথ বিনিয়োগের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের সকদিরামপুর গ্রামের সফিকুর রহমান, মদনেরগাঁও গ্রামের জহিরুল হক (আরিফ)। জহিরুল হক আবার উপজেলা প্রাণী সম্পদ এর আওতায় একটি প্রকল্পে চাকরি করেন। তার মা ফয়েজুন্নেছা বলেন, ঋণের টাকা কোরবানিতে বিক্রির জন্য ষাঁড় গরু ক্রয় করেছেন।

সকদীরামপুর গ্রামের ঋণ গ্রহীতা নাজমা আক্তার। তিনি জানেন না কত টাকা ঋণ নিয়েছেন এবং কী কাজে। পরে জানালেন তার ভাই ইসমাইল জানেন এই বিষয়ে।

একই ইউনিয়নের মিনু বেগম, তফুরী বেগম, মো. নুর মিয়া, মো. ওয়াসিম হোসেন, ফাতেমা বেগম, নাছির উদ্দিন, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন গাজী, মো. সেলিম মিয়া, ফাহিমা আক্তার ও রৌশন আরা বেগম ঋণ নিলেও গাভী ক্রয় করেননি। এদের মধ্যে ওয়াসিম হোসেন ঋণের টাকায় নিম্নমানের ওষুধ কিনে মজুদ করেছেন। স্থানীয় ফার্মেসীতে তিনি এসব ওষুধ বিক্রি করেন।

চান্দ্রা দুগ্ধ সমিতির সমন্বয়ক ও ঋণ গ্রহীতা মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। তিনি নিজে, তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম, ঋণ গ্রহীতা নুরুন্নাহার আক্তার লাকী ও মো. নাছির উদ্দিন ঋনের টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন তাদের পূর্বের গরুর খামারে। তাদের এই খামারে আছে ২৮টি ষাঁড় গরু। এসব ষাঁড় বিক্রি করবেন কোরবানির হাটে।

গাজীপুর দুগ্ধ সমবায় সমিতির ৫০জন ঋণ গ্রহীতা ৩৩ জনের মধ্যে অনুসন্ধান চালানো হয়। এর মধ্যে ১৪ জনই গাভী ক্রয় করেননি। সমিতির ঋণ গ্রহীতা সাখাওয়াত হোসেন, রাজু হোসেন. মো. কাইয়ুম এর বাড়িতে গিয়ে গরুর কোন অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। তারা অন্যের গোয়াল ঘর দেখিয়ে ঋণ নিয়েছেন। সাখাওয়াত মুন্সিরহাট বাজারে জুতার ব্যবসায়ী, রাজু বাড়িতে থাকেন না এবং কাইয়ুম বালু ব্যবসায়ী। কাইয়ুম জানালেন, তিনি গোয়াল ঘর ঠিক করে গরু ক্রয় করবেন। গোবরচিত্রা গ্রামের মোহাম্মদ রাশেদ খান ও নুর হোসেন খানের বাড়িতে গিয়ে গোয়াল ঘরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এই সমিতির ঋণ গ্রহীতা সুখরঞ্জন, মরিয়ম বেগম, মো. সাইফুল, ফাতেমা বেগম, নাছিমা বেগম, জিয়াউল হক ও মো. আলমের বাড়িতে কোন গরু পাওয়া যায়নি। এদের মধ্যে ফাতেমা বেগম এর স্বামী সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির। তাদের বাড়িতে কোন লোক নেই। থাকেন চাঁদপুর শহরে। সাইফুল ইসলাম নামে ঋণ গ্রহীতা দেখালেন তার ভাইয়ের গোয়াল ঘর।
পাশবর্তী ঘড়িহানা গ্রামের সরদার বাড়িতে বেশ কয়েকজন নিয়েছেন ঋণের টাকা। তাদের আগ থেকে অনেকের গোয়ালঘর এবং বিভিন্ন ধরণের গরু আছে। এই বাড়ির জসিম উদ্দিন মিন্টু ছিলেন গাজীপুর দুগ্ধ সমিতির সমন্বয়ক। তিনি নিজ বাড়ির লোকদের এবং আশপাশের ১১ জনের ঋণ নেয়ার কাজে সহযোগিতা করেন। এদের মধ্যে অনেকেই আগ থেকে কোটি টাকা বিনিয়োগ করে খামার করেছেন।

জসিম উদ্দিন বলেন, এই ঋণ বিতরণের সময় সমিতিতে যাদের নাম ছিলো, চূড়ান্ত করার দিন তা পাওয়া যায়নি। উপজেলা সমবায় অফিসার এবং ওই কার্যালয়ের কর্মচারিরা তালিকা চূড়ান্ত করেছেন। ওইদিন আমি উপস্থিত হয়ে দেখলাম রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতি। ওই সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সামনে সাহস করে কোন কথা বলতে পারিনি। যে কারণে ঋণের টাকা বিতরণে অনিয়ম হয়েছে।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ঋণ বিতরণের জন্য দুটি সমিতির সদস্য যখন চূড়ান্ত হয়, তখন আমি এই উপজেলায় ছিলাম না। তবে ঋণ বিতরণ হয়েছে আমি দায়িত্বরত অবস্থায়। যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, তাদের বিষয়ে আমরাও তদন্ত করে দেখছি। কেউ কেউ কোরবানিতে বিক্রির জন্য ষাঁড় ক্রয় করেছেন।
তিনি আরো বলেন, আমাদের তদন্তে যাদের অনিয়ম পাওয়া যাবে, তাদের বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ ঋণের ২ লাখ টাকার মধ্যে ১লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও পরবর্তী ৪০ হাজার টাকা চেক বিতরণ অপেক্ষমান। এসব বিষয়গুলো সামনে রেখে আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম চালাতে হবে।

চাঁদপুর জেলা সমবায় কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, এই ঋণ বিতরণ সম্পর্কে আমি অবগত না। তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। এই ধরণের অনিয়ম হয়ে থাকলে প্রকল্পের দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হবে। যারা ঋণের টাকা নিয়ে অনিয়ম করেছেন তাদের বিষয়ে পরবর্তীতে নিদের্শনা আসবে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবো।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদপুরের সমবায়ী ও বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন শেখ বলেন, দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারের এই প্রকল্পটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ বিতরণ এবং নেয়ার ক্ষেত্রে যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে অব্যশই তাদের বিরুদ্ধে

 


গাজী মমিন, নিজস্ব প্রতিনিধি, ফরিদ্গঞ্জ ১৪-০৫-২০২৫ ০৩:৩৭ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 269 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  ঠিকানা :   চাঁদপুর বুলেটিন, সম্পাদকীয় কার্যালয়: পৌর মার্কেট (দ্বিতীয় তলা), হাজী মহসিন রোড, নতুন বাজার, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর (পূবালী ব্যাংকের সামনে)।
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   chandpurbulletin@gmail.com

সম্পাদক ও প্রকাশক: আলআমিন ভূঁইয়া