শিরোনামঃ
চাঁদপুর বুলেটিন ডেস্ক ২১-০৭-২০২৬ ০১:৪৭ পূর্বাহ্ন |
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে যেমন বৈচিত্র্য আসে, তেমনি গ্রামীণ জনপদেও দেখা মেলে নানা মৌসুমি খাদ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের। গ্রীষ্মের শেষ ভাগ এবং আষাঢ় মাসের শুরুতে দেশের চরাঞ্চলের হাট-বাজারে দেখা যায় এক বিশেষ ধরনের মুখরোচক খাদ্য, যা স্থানীয়দের কাছে ‘হোগল’ নামে পরিচিত। চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে বর্তমানে এই হোগল সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন শতাধিক কৃষক ও সংগ্রহকারী।
২০ জুলাই সোমবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা বাড়ির আঙিনা ও খোলা স্থানে হোগলা গাছের ফুল রোদে শুকাচ্ছেন। কোথাও শুকিয়ে যাওয়া ফুল আলতোভাবে টোকা দিয়ে সোনালি-হলুদ রঙের সূক্ষ্ম গুঁড়া সংগ্রহ করা হচ্ছে। দেখতে অনেকটা হলুদের গুঁড়া কিংবা ময়দার মতো হলেও এর রঙ হালকা হলুদ এবং স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়দের কাছে এটি একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মৌসুমি খাদ্য হিসেবে পরিচিত।
জানা যায়, মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয় হোগলা গাছ। বর্ষার শুরুতে গাছে ফুল এলে কৃষকরা নৌকায় করে চরাঞ্চলে গিয়ে সেই ফুল সংগ্রহ করেন। এরপর সংগ্রহ করা ফুল কয়েকদিন রোদে ভালোভাবে শুকানো হয়। শুকিয়ে গেলে ফুলগুলো ধীরে ধীরে টোকা দিলে ভেতর থেকে সূক্ষ্ম গুঁড়া বের হয়ে পাত্রে জমা হয়। পরে সেই গুঁড়া পাতলা চালুনি দিয়ে ছেঁকে বিশুদ্ধ হোগল আলাদা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ হলেও এটি স্থানীয় মানুষের জন্য একটি মৌসুমি আয়ের উৎস।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হোগল নামের খাবারটি দুধ, নারকেল, চিনি কিংবা গুড় মিশিয়ে রান্না করলে অত্যন্ত সুস্বাদু খাবারে পরিনত হয়। অনেক পরিবারে বিশেষ অতিথি আপ্যায়ন কিংবা পারিবারিক আয়োজনেও এই খাবার পরিবেশন করা হয়। এছাড়া শিশু থেকে শুরু করে বয়স্কদের কাছেও এটি বেশ জনপ্রিয়।
চরভৈরবী ইউনিয়নের পাড়া বগুলা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে হোগল সংগ্রহ ও বাজারজাত করেই আমরা জীবিকা নির্বাহ করছি। মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে চর থেকে হোগলা ফুল কেটে আনতে অনেক কষ্ট হয়। এরপর শুকানো, গুঁড়া সংগ্রহ ও বাজারে বিক্রি—সব মিলিয়ে কাজটি খুবই পরিশ্রমের। তবে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় বলেই সেই কষ্ট আর কষ্ট মনে হয় না।”
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি হোগল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের হোগলের চাহিদা থাকায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন উপজেলাতেও এটি বিক্রি করা হয়। অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে হোগল কিনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। ফলে বর্ষা মৌসুমে এটি অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।
তবে কৃষি বিভাগের মতে, হোগলা গাছ অর্থনৈতিকভাবে কিছু মানুষের উপকারে এলেও এর ব্যাপক বিস্তার কৃষির জন্য ইতিবাচক নয়। হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ শাকিল খন্দকার বলেন, “আমরা কৃষকদের হোগলা গাছের পরিকল্পিত চাষ না করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। কারণ, হোগলা দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চলে যেসব হোগলা স্বাভাবিকভাবে জন্মায়, সেখান থেকে ফুল সংগ্রহে কৃষি বিভাগের আপত্তি নেই। তবে কৃষিজমিতে নতুন করে হোগলার আবাদ না করে লাভজনক ও খাদ্যশস্যভিত্তিক ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, হোগল শুধু একটি মৌসুমি খাদ্য নয়, এটি হাইমচরের চরাঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও একটি অংশ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই গ্রামীণ জনপদে হোগল সংগ্রহের এই চিত্র দেখা যায়। কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে কৃষকেরা প্রকৃতির দেওয়া এই সম্পদ সংগ্রহ করেন এবং তা বাজারজাত করে সংসারের খরচ মেটান।
প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া এই মুখরোচক খাদ্য একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য এনে দেয়, অন্যদিকে অনেক পরিবারের জন্য মৌসুমি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও ভূমিকা রাখছে। তবে কৃষি উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষায় পরিকল্পিতভাবে হোগলা চাষ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঠিকানা : চাঁদপুর বুলেটিন, সম্পাদকীয় কার্যালয়: পৌর মার্কেট (দ্বিতীয় তলা), হাজী মহসিন রোড, নতুন বাজার, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর (পূবালী ব্যাংকের সামনে)।
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : chandpurbulletin@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলআমিন ভূঁইয়া