শিরোনামঃ
পারভেজ মোশারফ, নিজস্ব প্রতিনিধি ২৭-০৭-২০২৬ ১১:৫০ পূর্বাহ্ন |
প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই নৌপথ ব্যবহার করতেন। ফলে চাঁদপুর লঞ্চঘাট ছিল দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাণচঞ্চল নৌকেন্দ্র। স্বল্প খরচ, তুলনামূলক কম সময়, নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই রুটে লঞ্চে যাতায়াত করতেন। ডেক থেকে শুরু করে কেবিন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, খাবারের সুবিধা, পর্যাপ্ত চলাচলের স্থান এবং ওয়াশরুম—সব মিলিয়ে লঞ্চ ভ্রমণ ছিল অনেকের প্রথম পছন্দ।
কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর এই রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর যাত্রাসময়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। আগে যেখানে আড়াই থেকে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টার মধ্যে চাঁদপুর–ঢাকা যাতায়াত করা যেত, এখন সেখানে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। যাত্রীদের অভিযোগ, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অনেক লঞ্চ একটিমাত্র ইঞ্জিন ব্যবহার করে ধীরগতিতে চলাচল করায় এই অতিরিক্ত সময় ব্যয় হচ্ছে।
শুধু যাত্রাসময়ই নয়, বেড়েছে ভাড়াও। একসময় সাধারণ ডেকের ভাড়া ছিল ১০০ টাকা। পরে তা এক লাফে ১৯০ টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০২৫ সালে ভাড়া কিছুটা কমিয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও ২০২৬ সালে আবার তা বাড়িয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য শ্রেণির ভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ যাত্রাসময় যেমন বেড়েছে, তেমনি ভাড়াও প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন।
এ ছাড়া যাত্রীদের নিত্যদিনের ভোগান্তির তালিকাও কম নয়। চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে প্রবেশের সময় ১০ টাকা ফি দিতে হলেও সে অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা পাওয়া যায় না। লঞ্চঘাটে সিএনজিচালকদের টানাহেঁচড়া, লঞ্চে খাবারের অতিরিক্ত মূল্য, কিছু স্টাফের অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং সদরঘাটে কুলিদের হয়রানি—এসব সমস্যাও যাত্রীদের নৌপথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে।
এর ফলও এখন দৃশ্যমান। একসময় যে নৌপথ দিন-রাত যাত্রীতে মুখর থাকত, সেখানে এখন যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যাত্রীসংকটের কারণে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী লঞ্চ ছেড়েও যায় না।
চাঁদপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে এই নৌপথ গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই এই রুটের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ, লঞ্চ মালিক সমিতি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উচিত যাত্রীদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। যাত্রাসময় যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, ভাড়া সহনীয় রাখা, টার্মিনালের সেবার মান উন্নয়ন, যাত্রী হয়রানি বন্ধ এবং লঞ্চে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা, চাঁদপুর–ঢাকা নৌপথ আবার তার হারানো ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তা ফিরে পাক। কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের অবনতি শুধু যাত্রীদের নয়, পুরো অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চাঁদপুর–ঢাকা নৌপথকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই নৌরুট ধীরে ধীরে তার অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলবে।
ঠিকানা : চাঁদপুর বুলেটিন, সম্পাদকীয় কার্যালয়: পৌর মার্কেট (দ্বিতীয় তলা), হাজী মহসিন রোড, নতুন বাজার, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর (পূবালী ব্যাংকের সামনে)।
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : chandpurbulletin@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলআমিন ভূঁইয়া